ডা. রিয়াদ শরীফ

ডা. রিয়াদ শরীফ

জুনিয়র কনসালটেন্ট, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ


০১ অগাস্ট, ২০২৩ ১২:৫২ পিএম

‘ঘুমের ওষুধ পুশ করার সময় বুঝতে পারি, এ ঘুম হয়তো আর ভাঙবে না’

‘ঘুমের ওষুধ পুশ করার সময় বুঝতে পারি, এ ঘুম হয়তো আর ভাঙবে না’
প্রতীকী ছবি

স্ট্রেচারে শোয়ানো মেয়েটা গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করছিলে, মনে হয় এক্ষুণি ডেলিভারি হবে। আমি বের হয়ে চলে যাচ্ছিলাম। ম্যাডাম দেখে বললেন, আরে মনে হচ্ছে এটাতো রাপচার, এক্ষুণি অপারেশন লাগবে। ব্লাড রেডি করে তাড়াতাড়ি অপারেশ থিয়েটরে (ওটি) পাঠাও।

রোগীর সঙ্গে থাকা লোকজন নির্বিকার। আগেরটা সিজার, এবার যেভাবেই হোক, তারা নরমাল ডেলিভারি করবেই। অনেক হাসপাতাল ঘুরে এসেছে, কেউ রাজি হয়নি। এ রকম কিছু রোগী মাঝে মাঝে পাই, অ্যাম্বুলেন্সে করে সমস্ত শহরে সব হাসপাতালে চক্কর দিবে, আবার সরকারি হাসপাতালেও যাবে না।

রোগীর কনসেন্ট ছাড়া কিছু করা সম্ভব হয় না। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। গাড়িতে বসে রোগীর বড় বড় চোখগুলো খুব মনে পড়ছে। আমাদের যে প্রফেশন, এ রকম ঘটনা দাগ কাটে খুব অল্প সময়ের জন্যই। এবারও তাই। বাসায় এসে সারাদিনের সব ব্যস্ততা এমনিতেই ভুলে যাই। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমন্ত ছেলেকে চুমু খেয়ে নিজেই কখন ঘুমিয়ে যাই টেরও পাই না।

আমি ঘুমালেও মোবাইলটা সাইলেন্ট করি না। গভীর রাতে প্রফেসর নমিতা ম্যাডাম নিজেই ফোন দিলেন। সেই রোগীটা কনসেন্ট দিয়েছে। জানতে চাইলাম, কোন রোগী ম্যাডাম? ওই যে স্ট্রেচারে শোয়ানো, মনে হচ্ছিল রাপচার। বলেন কি, সেই রোগী এখনো যায়নি? না যায়নি তো, কি মুশকিল বলো তো।

মুশকিল শব্দটা আমরা অনেক শুনি, যত মুশকিল তত আসান। আসলে সবসময় আসান হয় না, তবু আমরা চেষ্টা করি একেবারে শেষ পর্যন্ত। ইন্টার্ন সময়ে কোনো রোগীর মৃত্যুর সময়, কিছু না পারলেও লাভ হবে না জেনেও একটা ওরাডেক্সন ইনজেকশন দিতাম। 

সারা রাস্তা রোগীর লোকজনকে গালাগালি দিয়ে আসলাম, তবে ওটিতে রোগী দেখে আমি আসলেই স্তম্ভিত। একেবারে পেপার ওয়াইট। হুমায়ূন আহমেদের একটা ছোট গল্প পড়েছিলাম। একটা বাচ্চা মেয়ে, যে কিনা হাসপাতালে যে রোগী মারা যাবে, তার মৃত্যুর ছায়া দেখতে পেতো। ছায়াটা অনেকটা পশুর মতো। আমার কোন অলৌকিক ক্ষমতা নেই, তবু আমি যেন, মেয়েটির মুখে মৃত্যুর ছায়া দেখতে পেলাম। কেমন টেনে টেনে নিশ্বাস নিচ্ছে, যেটিকে আমরা বলি গ্রাসপিং। এ অবস্থায় পিছানো যায় না, তবু আফসোস লাগছে, তখন যদি অপারেশনের কনসেন্ট দিতো। 

ম্যাডাম ওয়াশ নিয়ে রেডি, আমি ঘুমপাড়ানির ওষুধ পুশ করবো। বুঝতে পারছি, এ ঘুম হয়তো আর ভাঙবে না। ঠিক তখন মেয়েটি স্পষ্ট করে বললো, স্যার, আমি তো থাকবো না, যারা আমার এ অবস্থা করেছে, আপনি তাদের বিচার করবেন। এদের সবারই আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। টেনে টেনে নিশ্বাস নেওয়া মেয়েটির এত স্পষ্ট কথা! ওটির সবাই শুনতে পেলো। আমি কিছু বললাম না, শুনলাম ম্যাডাম বলছেন, কিছু হবে না আপনার, ভালো হয়ে যাবেন।

এ ঘটনাটি সেন্ট্রাল হাসপাতালের ঘটনার মাসখানেক আগে। শুনেছি আঁখি মেয়েটাও নাকি অনেক কষ্ট পেয়েছে। সেই কুমিল্লা থেকে লেবার পেইন নিয়ে ঢাকায় এসেছে। আচ্ছা ওটি টেবিলে আঁখিও কি বলেছিল, যারা আমার এ অবস্থা করেছে আল্লাহ যেন তাদের বিচার করে।

কি জানি, হয়তো বলেছিলো, হয়তো না, হয়তো কত আঁখি এমন প্রতিদিন আল্লাহর কাছে বিচার দেয়। কি যায় আসে তাতে।

এএইচ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
অনুপস্থিতি ও বেসরকারি হাসপাতালে মালিকানা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা

অনুপস্থিতি ও বেসরকারি হাসপাতালে মালিকানা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত